বই কিনব, বই পড়ব, কিন্তু কোন বই?

বই কিনব, বই পড়ব, কিন্তু কোন বই?

সুরসিক সাহিত্যিক প্রমথ চৌধুরী ‘বই পড়া’ প্রবন্ধে লিখেছিলেন, ‘বই পড়া শখটা মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ শখ হলেও আমি কাউকে শখ হিসেবে বই পড়তে পরামর্শ দিতে চাই নে। প্রথমত, সে পরামর্শ কেউ গ্রাহ্য করবেন না। কেননা, আমরা জাত হিসেবে শৌখিন নই; দ্বিতীয়ত, অনেকে তা কুপরামর্শ মনে করবেন। কেননা, আমাদের এখন ঠিক শখ করার সময় নয়। আমাদের এই রোগশোক, দুঃখ-দারিদ্র্যের দেশে সুন্দর জীবনধারণ করাই যখন হয়েছে প্রধান সমস্যা, তখন সে জীবনকেই সুন্দর করা, মহৎ করার প্রস্তাব অনেকের কাছে নিরর্থক এবং নির্মমও ঠেকবে।’

প্রমথ চৌধুরীর সংশয় সত্ত্বেও বিদ্বৎসমাজ বরাবরই বই পড়ার পরামর্শ দিয়েছেন। জীবনকে সুন্দর ও মহৎ করার জন্য বই পড়ার বিকল্প নেই। প্রমথ চৌধুরীর সময় বই অল্প প্রকাশিত হলেও তা ছিল মানসম্পন্ন। ফলে চোখ বন্ধ করে যে কোনো বই পড়ার পরামর্শ তখন দেওয়া যেত। ‘বই কেনা’ প্রবন্ধটি যখন সৈয়দ মুজতবা আলী লেখেন, তখনও মানহীন বই বাজার দখল শুরু করেনি। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশক অবসানের মুখে এ প্রশ্ন মনে জাগছেই-বই পড়ব, বই কিনব কিন্তু কোন বই?
নিন্দুকেরা বলছেন, পাঠকের চেয়ে লেখকের সংখ্যা বেড়েছে। প্রতি বছর বইমেলায় নতুন লেখকের আবির্ভাব ঘটে। নতুন প্রকাশনা সংস্থাও হাজির হয়। কোনো সন্দেহ নেই, নতুন লেখক বা প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের জন্ম সুসংবাদ। কিন্তু এটি দুঃসংবাদে রূপান্তরিত হয় যদি প্রকাশিত বইয়ের মান নিম্নগামী হয়। মানহীন বইয়ের সংখ্যা যদি মহামারি আকার ধারণ করে, তখন বইমেলা শুধু ধূলিদূষণ নয়, বইদূষণেরও শিকার হয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বইয়ের প্রচারকে সহজলভ্য করে দিয়েছে। বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, প্রকাশনা উৎসব, বই আলোচনা চিরাচরিত সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতির ভেতরে ঠাঁই করে নিয়েছে মানহীন বই। কোনো কোনো গণমাধ্যমের বাছবিচারহীন প্রচারের কারণে গুরুত্বহীন বই দৃষ্টি আকর্ষণ করে, ভালো বই চলে যায় দৃষ্টির অন্তরালে। যে কোনো বই জীবনকে সুন্দর ও মহৎ করতে পারে না। বৈভবমণ্ডিত সেই বইগুলো যেন পাঠকের দৃষ্টিগোচর হয়, এটি নিশ্চিত করা জরুরি। ‘প্রচারেই প্রসার’- এই আপ্তবাক্যের অপব্যবহার কাম্য নয়।

একজন সাধারণ পাঠকের পক্ষে এই জগাখিচুড়ি পরিস্থিতির মধ্যে প্রকৃত বইকে শনাক্ত করা কষ্টসাধ্য। খ্যাতিমান প্রকাশকদের দুঃখ প্রকাশ করে বলতে শুনেছি, সবচেয়ে মানসম্পন্ন বইয়ের প্রতি পাঠকের আগ্রহ কম; হালকা, অগভীর বইয়ের চাহিদা বেশি। অনুসন্ধিৎসু, মননশীল পাঠক নিশ্চয়ই আছেন। কিন্তু তাদের কাছে প্রকৃত বইয়ের খবর না পৌঁছানো কিংবা সস্তা, চটকদার বইয়ের পাঠক বৃদ্ধি বই বিপণনের ব্যর্থতাকেই প্রকট করে তোলে।
ভালো বইকে পাঠকসাধারণের দৃষ্টিগোচর করার ক্ষেত্রে বই আলোচনা তথা সাহিত্য সমালোচনা অত্যন্ত জরুরি। পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, আমাদের সমালোচনা সাহিত্য এখনও তার দারিদ্র্য ঘোচাতে পারেনি। সমালোচনা সাহিত্য শুধু সাহিত্যের একটি বিশেষ শাখা নয়, গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের প্রসারেও এটি কার্যকর ভূমিকা পালন করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই সহজলভ্য প্রচার যে কোনো বইকে পরিচিতি দিতে পারে, স্থায়িত্ব দিতে পারে না। সমালোচনা সাহিত্যের সবল সংস্কৃতি গড়ে উঠলে উৎকৃষ্ট বইয়ের খবর পাঠকের কাছে পৌঁছাবে।

সারা বছর বই প্রকাশের রীতিতে এখনও অভ্যস্ত হতে পারেনি আমাদের প্রকাশনা জগৎ। গুটিকয়েক ব্যতিক্রম বাদে ফেব্রুয়ারির বইমেলাকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে প্রকাশনা সংস্থাগুলো। অধিকাংশ লেখকের জন্যও এটি প্রযোজ্য। নিজের গুরুত্বপূর্ণ বইটি প্রকাশের জন্য তারাও বেছে নেন ফেব্রুয়ারি মাসকে। পাঠক সম্প্রদায়ও এর বাইরে নন। স্বল্প সংখ্যক পাঠকই সারা বছর বইয়ের খবর রাখেন। এ অবস্থা থেকে বের হতে না পারলে এ দেশের প্রকাশনা শিল্প পেশাদারিত্ব অর্জন করতে পারবে না।
মানসম্পন্ন বই থাকলেও পাঠক পড়ছেন না-এমন দৃশ্য বিরল নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গ্রন্থাগার। দিনের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে লাইব্রেরির সামনে অগণিত ছাত্রছাত্রীর ব্যাগ রাখা থাকে সারি ধরে। লাইব্রেরি খোলার আগ মুহূর্তে ছাত্রছাত্রীরা নিজের ব্যাগ সরিয়ে সেখানে দাঁড়ায়। লাইব্রেরির সামনে এমন দৃশ্য দেখে অভিভূত হওয়া অস্বাভাবিক নয়। ভেতরে ঢুকলে দেখা যাবে উল্টো চিত্র। লাইব্রেরির শ্রেষ্ঠ কোনো বই নিয়ে নয়, ছাত্রছাত্রীরা ডুবে আছে বিসিএস পরীক্ষার গাইড নিয়ে। সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারেই কমবেশি এই চিত্র দেখা যাবে। একই চিত্র শাহবাগের কেন্দ্রীয় গণগ্রন্থাগারেও। কয়েকদিন আগে একটি বিভাগীয় শহরের গণগ্রন্থাগারেও ভিন্ন কিছু দেখিনি। সকাল ১০টায় হুড়মুড় করে ছাত্রছাত্রীরা ঢুকে পড়েছে সেখানে। বিসিএস, ব্যাংক, বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষার গাইড টেবিলে টেবিলে। এই ‘পাঠকদের’ প্রতিপত্তির কারণে প্রকৃত পাঠক বসারই চেয়ার পাচ্ছে না। বুকশেলফের তাকের পর তাক অবহেলায় পড়ে আছে চিরায়ত সাহিত্যসহ নানা মূল্যবান বই নিয়ে। গণগ্রন্থাগারে বসে চাকরির প্রস্তুতি নেওয়ার এই দৃশ্য সম্ভবত প্রত্যেক জেলা শহরেই বিদ্যমান। এই সংস্কৃতি বই পড়ার প্রকৃত উদ্দেশ্য সাধনে প্রতিবন্ধক।

বই মানুষকে চিন্তাশীল করে, তার ভেতরে শুভবুদ্ধির উন্মেষ ঘটায়। প্রায় শতবর্ষ আগে প্রকাশিত ‘শিখা’ পত্রিকার মর্মবাণী ছিল- জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব। সীমাবদ্ধতার প্রাচীর ভাঙতে পারলে মুক্তবুদ্ধির বিস্তার ঘটে এবং অন্ধকার থেকে মুক্তিলাভ সম্ভব হয়। এ ক্ষেত্রে বইমেলা শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে পারে। এটি আশার কথা যে, স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে বইমেলা এখন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু বইমেলার সুফল অর্জিত হবে না, যদি মানহীন বই ও প্রকাশনা সংস্থার ভিড়ে প্রকৃত বই হারিয়ে যায়।

চাকরিসর্বস্ব পাঠকদের ভিড়ে চিন্তাশীল পাঠক কোণঠাসা। প্রকৃত লেখক অলেখকদের ভিড়ে বিব্রত, নামগোত্রহীন মৌসুমি প্রকাশকদের প্রাবল্যে অস্বস্তিতে রয়েছেন পেশাদার প্রকাশকগণ। এই অবস্থার পরিবর্তন যদি না ঘটে, নিঃসন্দেহে দুর্দিন অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। একুশে বইমেলার বিস্তৃতি, প্রকাশিত বইয়ের পরিমাণ, বিক্রির হিসাব একটি সংখ্যামাত্র। বইয়ের গুণগত মান যদি বৃদ্ধি না পায়, তবে এটি শুধু লেখক-প্রকাশকের জন্য নয়, জাতি হিসেবেও আমাদের নিদারুণ ব্যর্থতা হিসেবে গণ্য হবে। বই পড়া, বই কেনার পরামর্শ এখন আর যথেষ্ট নয়। জরুরি প্রশ্ন হচ্ছে, মানসম্পন্ন বই চিহ্নিত করা যাচ্ছে কিনা, সেই বই পাঠকের কাছে পৌঁছাচ্ছে কিনা।

 

রাজীব সরকার
প্রাবন্ধিক ও গবেষক

সৌজন্যে: দৈনিক সমকাল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are makes.